Header Ads

মানুষের আহার কেমন হওয়া উচিত।

 মানুষের আহার কেমন হওয়া উচিত।


মানুষের জীবিত থাকার জন্য বায়ু এবং জলের পর সর্বাধিক প্রয়োজনীয় বস্তু হল আহার। মানুষের আহার্য কেমন হবে, তার উদ্দেশ্য কী, সেটি কী এবং তা কতোটা হবে, তার দিকে লক্ষ্য দেওয়া প্রয়োজন।


মানুষের আহারের উদ্দেশ্য-ভোজনে মানুষের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র উদর পূর্তি, স্বাস্থ্য রক্ষা বা স্বাদ নয়; বরং মানসিক এবং চারিত্রিক বিকাশও তার লক্ষ্য। আমাদের আচার, বিচার, ব্যবহার সবকিছুর সঙ্গেই আহারের গভীর সম্পর্ক আছে। প্রসিদ্ধ উক্তি আছে যে 'যেমন খাদ্য খাবে, তেমনি মন তৈরি হবে'- আজ একথা সম্পূর্ণ সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।

মানুষ যেসব পশু পক্ষীর মাংস আহার করে, সেই পশু-পক্ষীর গুণ, আচরণ ইত্যাদি তার মধ্যে সঞ্চারিত হয়, ফলে তার প্রকৃতিও ক্রমশঃ সেইরূপ হতে থাকে। সেইজন্য সেই ব্যক্তি ইহজন্মেই মনুষ্যোচিত স্বভাব থেকে প্রায়শঃ চ্যুত হয়ে পশুস্বভাবসম্পন্ন, ক্রূর ও অমর্যাদাপূর্ণ জীবন পন করতে থাকে এবং মৃত্যুর পর সেই ধারণার ফলস্বরূপ, আর নিজ কর্মের ফল ভোগ করার জন্য সেই পশু-জন্ম প্রাপ্ত হয়ে মহাদুঃখ ভোগ করে।

পিতামহ ভীষ্ম বলেছেন-


আহার নিরামিষ না আমিষ ? সিদ্ধান্ত নিজেই নিন


যেন যেন শরীরেণ যদ্যৎ কর্ম করোতি যঃ।


তেন শরীরেণ তত্তৎ ফলমুপাশুতে। (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১১৬।২৭)


'যে যে শরীরে প্রাণী যেমন যেমন কর্ম করে, সেই সেই শরীর লাভ করে সে তেমন তেমনই ফল ভোগ করে।'


মানুষের বিভিন্ন প্রকারের আহারের প্রতি রুচি তার আচরণ ও চরিত্র প্রকাশ করে। তাই আমাদের আহারের উদ্দেশ্য হবে সেই সব পদার্থ গ্রহণ যা আমাদের শারীরিক, নৈতিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক উন্নতিকারী এবং স্নেহ, প্রেম, দয়া, অহিংসা, শান্তি ইত্যাদি গুণের বৃদ্ধিকারী হয়।


মানুষের আহার কেমন হবে - আহার এমন সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে যাতে শরীরে শক্তি, পুষ্টি এবং উত্তাপ বজায় থাকে ; প্রোটিন, শর্করা, ভিটামিন, খনিজ জাতীয় পদার্থ অনুপান ও পর্যাপ্ত মাত্রায় থাকা প্রয়োজন যাতে শরীরে ভালো ভাবে নতুন কোষ (New Cells) এবং R.B.Cs. তৈরি হয়, কারণ আমাদের শরীরে লক্ষ লক্ষ R.B.C. (Red Blood Corpuscle) প্রতি সেকেণ্ডে ধ্বংস হয় ও উৎপন্ন হয়।

এরূপ অনুমান করা হয় যে ছয় বছরে আমাদের শরীরের সকল কোষাণু (Cells and Tissues) (১) সম্পূর্ণভাবে বদলে যায় অর্থাৎ সাপ যেমন প্রত্যেক ছয় মাসে তাদের চামড়া (Skin) পরিবর্তন করে, তেমনই ছয় বছরে আমাদের শরীরের সমস্ত কোষাণু (Cell and Tissues) সম্পূর্ণভাবে বদলে যায়, যার গুণাগুণ আমাদের খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল।


সেই সঙ্গে আহার্যে এমন পদার্থ থাকা উচিত যাতে শরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা এবং শরীরের ময়লা এবং ক্ষতিকারক জিনিষ (poisons) বার করার পথে বাধা না হয়। খাদ্যে রোগ উৎপাদক, স্বাস্থ্যনাশক এবং উত্তেজনাকারী বস্তু যেন না থাকে, কারণ তাতে মানসিক শান্তি নষ্ট হয়ে আবেগের জন্ম দেয় আর মানুষকে অমর্যাদাসম্পন্ন ও উচ্ছৃঙ্খল করে তোলে।


মানুষের খাদ্য কী হবে- প্রকৃতি মানুষের আহারের জন্য নানাপদার্থ আনাজ, ফল, শাক-সব্জী ইত্যাদি উৎপন্ন করেছে, যাতে সর্বপ্রকার পুষ্টিদায়ক বস্তু পর্যাপ্ত মাত্রায় বিদ্যমান।


(৩) প্রকৃতি মানব-শরীর নিরামিষাশী জীবদের মতোই সৃষ্টি করেছেন এই জগতে নিরামিষ ও আমিষ-আহারী জীবদের বহু জাতি এবং অনেক প্রকার ছোট থেকে বড়ো আকারের বিভিন্ন প্রকারের জীব আছে, কিন্তু নিরামিষ খাদ্য গ্রহণকারী জীবদের শরীরের গঠন, হাত, পা, দাঁত ইত্যাদি এবং তাদের দেখার, ঘ্রাণ নেবার শক্তি এবং খাওয়া-দাওয়ার ভঙ্গী মাংসাহারী জীবদের থেকে পৃথক হয়।


যেমন- ১) মাংসাহারী জীবদের নখ ও দাঁত শাণিত হয় যাতে তারা শিকার ধরে কেটে ছিঁড়ে খেতে পারে।


নিরামিষাশী জীবদের দাঁত তত শাণিত হয় না, হাতের থাবার নখও তত তীক্ষ্ণ হয় না যাতে শিকারকে কাটা-ছেঁড়া করা যায়। তাদের দাঁত ও নখ ফল ইত্যাদি খাবার উপযুক্ত হয়ে থাকে।

২) নিরামিষাশী জীবদের নীচের চোয়াল শুধুমাত্র ওপরে-নীচে নড়াচড়া করে এবং তারা খাবার না চিবিয়েই গিলে ফেলে। নিরামিষাশী জীবদের নীচের চোয়াল ওপর, নীচে, ডাইনে, বাঁয়ে-সব দিকেই নড়াচড়া করে এবং তারা খাবার চিবিয়ে খায়।


৩) মাংসাহারী জীবদের জিভ ধারালো (কর্কশ) হয়, তারা জিভ বার করে তার দ্বারা জল পান করে। নিরামিষাশীদের জিভ নরম হয়, তারা জলপান করার জন্য জিভ বার করে না, বরং ঠোঁট দিয়ে জল পান করে।


মাংসাহারী জীবদের অস্ত্র (Digestive system) কম লম্বা হয়, সেটি প্রায়শঃ তাদের দেহের দীর্ঘতার সমান লম্বা হয় এবং কোমর থেকে গলা পর্যন্ত দেহাংশের ৬ গুণ লম্বা হয়। অন্ত্র ছোট হওয়ায় মাংস পচন ধরা বা বিষাক্ত হওয়ার আগেই তা শরীর থেকে বার হয়ে যায়।


নিরামিষাশী জীবদের অস্ত্র (Digestive system) অধিক লম্বা হয়, সেটি তাদের দেহের দীর্ঘতার চার গুণ ও মূল দেহের থেকে ১২ গুণ বেশি লম্বা হয়, তাই প্রকৃতি মানব শরীর নিরামিষাশী জীবদের মতোই সৃষ্টি করেছেন সেটি মাংসকে শীঘ্র বাইরে ফেলতে পারে না।


(৫) মাংসাহারী জীবদের লিভার ও কিডনী অনুপাতে বড় হয়, যাতে মাংসের অপ্রয়োজনীয় অংশ সহজে দেহ থেকে বার হতে পারে। নিরামিষাশীদের লিভার ও কিডনী ছোট হয়, তা মাংসের অপ্রয়োজনীয় অংশ বাহিরে বের করতে পারে না।


৬) মাংসাহারী জীবদের পাচক যন্ত্রে মানুষের পাচক যন্ত্র থেকে দশগুণ বেশি হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড তৈরি হয়, যাতে মাংস সহজে হজম হয়। নিরামিষাশী জীবদের পাচক যন্ত্রে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড কম তৈরি হয়, তাই মাংস তেমন সহজে হজম হয় না।


৭) মাংসাহারী জীবদের স্যালিভা (মুখের লালা) অ্যাসিডিক (Acidic) হয়। নিরামিষাশীদের মুখের লালা (Saliva) এ্যালকাইন (Alkaline) হয় এবং তাদের লালায় টায়লিন (Ptyaline) থাকায় কার্বোহাইড্রেট্স হজমে সুবিধা হয়।


(৮) মাংসাহারী জীবদের রক্তে PH কম থাকে ফলে তাতে Acidic inclination থাকে। নিরামিষাশীদের রক্তে PH বেশি হয় ফলে সেটির propensity Alkaline মুখি হয়।

৯) মাংসাহারী জীবদের Blood Lipo-Proteins ভিন্ন প্রকারের হয়। নিরামিষাশী মানুষ ও পশুদের ব্লাড লিপো প্রোটিন একই ধরনের হয় এবং মাংসাহারী জীবদের থেকে তা ভিন্ন প্রকারের হয়।


১০) মাংসাহারী জীবদের ঘ্রাণশক্তি তীব্র হয়, রাত্রে তাদের চোখ জ্বলজ্বল করে এবং দিনের মতোই দেখতে পায়। এই শক্তি তাদের শিকার করায় সাহায্য করে। নিরামিষাশী জীবদের ঘ্রাণশক্তি তত তীব্র নয় এবং রাত্রে দিনের মতো দেখার শক্তি থাকে না।


১১) মাংসাহারী জীবদের আওয়াজ কর্কশ ও ভয়ংকর হয়। নিরামিষাশী জীবদের আওয়াজ কর্কশ হয় না।


১২) মাংসাহারী জীবদের বাচ্চারা জন্মের পর প্রায় এক সপ্তাহ দেখতে পায় না।


নিরামিষাশী জীবদের বাচ্চারা জন্মের সময় থেকেই দেখতে পায়। উপরোক্ত তথ্যাদি দ্বারা জানা যায় যে, প্রকৃতি মানুষের সৃষ্টি করেছে। অন্যান্য শাকাহারী জীব তথা গরু, ঘোড়া, উট, জিরাফ, বলদ ইত্যাদি শাকাহারী জীবেদের মতো, তাদের নিরামিষ খাদ্য সহজে প্রাপ্ত করার ও হজম করার ক্ষমতা দিয়েছে।


মানুষ ব্যতীত জগতের কোনো জীব প্রকৃতি প্রদত্ত শরীর ও স্বভাবের বিপরীত আচরণ করতে চায় না। বাঘ-সিংহ ক্ষুধার্ত হলেও শাকাহারী হয় না এবং গরুর ক্ষুধা পেলেও সে মাংসাহারী হয় না, কারণ এসব তাদের স্বাভাবিক বা প্রকৃতি অনুকূল খাদ্য নয়।

মাংসাহারী পশু সারাজীবন মাংসাহার করে, কারণ এই তার খাদ্য। কিন্তু মানুষ শুধু মাংসাহার করে বেশিদিন জীবিত থাকতে পারে না কারণ শুধু মাংস খেলে তার শরীরে এতো বেশি অ্যাসিড এবং টক্সিন উৎপন্ন হবে যে ফলে তার শরীরের সঞ্চালন ক্রিয়া বিকল হয়ে যাবে।

যে ব্যক্তি প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে মাংসাহার করে, তার কিছু না কিছু নিরামিষ আহার করতেই হয়, কারণ শুধুমাত্র মাংসাহার অপূর্ণ খাদ্য এবং তাতে মানুষের আয়ুক্ষীণ হয়। এস্কিমোরা (Eskimos) যে পরিস্থিতিতে প্রায়শঃ মাংসাহার করে থাকে, তাদের গড় আয়ু মাত্র ত্রিশ বৎসর হয়। কিন্তু নিরামিষ খাদ্য গ্রহণকারী মানুষ সুস্থভাবে দীর্ঘায়ু হয়ে থাকে।

(১)জন্‌স্‌ হোপকিন্স ইউনিভার্সিটির ডাঃ এলন ওয়াকার দাঁতের Mycroscopic Analysis করে বলেছেন যে, মানুষ নিরামিষাশীদের বংশধর, মাংসাহারীদের নয়।

কোনো ব্যক্তিই ফল, সব্জী, আনাজ দেখে মুখ ফেরায় না, কিন্তু অনেকেই ঝোলানো মাংস দেখে ঘৃণা করে। এটা কি মানুষের স্বাভাবিক শাকাহারী প্রকৃতির দ্যোতক নয় ?


উপরোক্ত সকল তথ্যই প্রমাণ করে যে, প্রকৃতি মানুষকে নিরামিষাশী এবং নিরামিষ খাদ্যেরই অনুকূল করে সৃষ্টি করেছেন।




No comments

Theme images by sndrk. Powered by Blogger.