নিরামিষ খাবার কি? নিরামিষ খাওয়ার উপকারিতা।
নিরামিষ খাবার কি? নিরামিষ খাওয়ার উপকারিতা।
নিরামিষ খাবার বেশি পুষ্টিকারক উপকারিতা ও গুণসম্পন্ন
আধুনিকতাবশতঃ নিজ সংস্কৃতি, আচার-বিচার, ব্যবহার সব কিছুকে জলাঞ্জলি দেওয়া ব্যক্তিদের মিথ্যাধারণা হল যে শাকাহারে উচিত মাত্রায় প্রোটিন বা শক্তিবর্ধক পুষ্টি প্রাপ্তি হয় না। কিন্তু এটি ঠিক নয়।
আধুনিক বৈজ্ঞানিকদের গবেষণায় জানা যায় যে, নিরামিষ খাদ্যে শুধু যে উচ্চশ্রেণীর প্রোটিন প্রাপ্ত হয় তাই নয়, নিরামিষ খাওয়ার অনেক উপকারিতা রয়েছে, এমনকি অন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ, ক্যালোরী ইত্যাদিও বেশি মাত্রায় পাওয়া যায়। সোয়াবীন, চিনাবাদাম ইত্যাদিতে মাংস বা ডিমের থেকে বেশি প্রোটিন থাকে।
সাধারণ ডালেও প্রোটিনের মাত্রা কম থাকে না। গম, চাল, জোয়ার, বাজরা, ভুট্টা ইত্যাদির সঙ্গে উপযুক্ত পরিমাণে ডাল এবং সবুজ সবজী আহার করলে শুধু যে প্রোটিনের প্রয়োজন পূর্ণ হয় তাই নয়, এর দ্বারা সম্পূর্ণ ব্যালান্স খাদ্য প্রাপ্তি হয়, যা নিরামিষাশী ব্যক্তিকে আমিষাশী থেকে বেশি সুস্থ, নীরোগ এবং দীর্ঘায়ু প্রদান করে।
মাংসের নিজস্ব কোন স্বাদ নেই, তাতে তেল, ঝাল, মশালা আদি মেশালে তবেই সেটির স্বাদ হয় কিন্তু ফল, সবজী, মেওয়া ইত্যাদির স্বতন্ত্র নিজস্ব স্বাদ রয়েছে এবং মশলাপাতি ছাড়াও তা খাওয়া যায়।
পশুজগতের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, যেসব পশু সর্বাধিক শক্তিশালী, পরিশ্রমী এবং অধিক সহনশীল এবং বেশিদিন একনাগাড়ে কাজ করতে পারে, যেমন হাতি, ঘোড়া, বলদ, উট ইত্যাদি, এগুলি সবই শাকাহারী। ইংল্যাণ্ডে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, স্বাভাবিক মাংসাহারী শিকারী কুকুরকেও যখন নিরামিষাশী করে রাখা হয়, তখন তার সহ্যশক্তি ও ক্ষমতা বাড়ে।
এভারেষ্ট বিজয়ী তেনজিৎ শেরপাদের শক্তির রহস্য নিরামিষাশী হওয়া বলেই জানিয়েছেন। বহু আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়ও আমিষ খাদ্য পরিত্যাগ করে নিরামিশাষী হচ্ছেন।
বহু গবেষক জানিয়েছেন নিরামিষাশী মানুষ বেশি সহনশীল, শক্তিশালী, পরিশ্রমী, শান্তস্বভাবযুক্ত এবং মিষ্ট স্বভাবের হয়। তারা অধিক সময় ক্ষুধা সহ্য করতে এবং উপবাস করার ক্ষমতা রাখে।
নিরামিষ বনাম আমিষ আহার
যদিও জগতে বহু লোক আমিষ আহার করেন, কিন্তু চিন্তা করলে এই কথাই প্রমাণিত হয় যে আমিষ আহার সর্বতোভাবে ক্ষতিকর। এর দ্বারা ইহলোক-পরলোক দুই-ই নষ্ট হয়। বহু লোক এমন আছেন, যাঁরা আমিষ খাদ্য ক্ষতিকারক জেনেও কু-অভ্যাসের বশবর্তী হওয়ায় এটি ত্যাগ করতে পারেন না।
কিছু লোক আবার আরাম ও ভোগাসক্তির বশীভূত হয়ে আমিষ খাওয়া সমর্থন করেন। কিন্তু আমিষ খাদ্য থেকে উৎপন্ন হওয়া দোষের কোনো সীমা নেই। হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রীষ্টান, জৈন, বৌদ্ধ আদি বিশ্বের সমস্ত বিশিষ্ট ধর্মের প্রচারক এবং মহাপুরুষগণ হিংসা, ক্রূরতা, অসত্য, ক্রোধ, দ্বেষ এবং অন্য জীবদের অকারণ কষ্ট বা পীড়া দেওয়াকে অপরাধ বলেছেন এবং অহিংসা, দয়া, ক্ষমা, সত্য, করুণা ইত্যাদিকে ধর্ম বলে জানিয়েছেন।
তাঁদের প্রধান শিক্ষা হল প্রাণীমাত্রেই সেই পরম পিতারই প্রকাশ দেখে সকলের সঙ্গে সুব্যবহার করা। এই সকল মহাপুরুষগণ শুধুমাত্র আমিষ আহারের নিন্দাই করেননি, তাঁরা সমস্ত জীব-জন্তু, পশু-পক্ষীদের প্রতি দয়া এবং করুণাপূর্ণ ব্যবহারের শিক্ষাপ্রদান করেছেন এবং খাদ্য ইত্যাদি দ্বারা তাদের জীবন-রক্ষা করাকে শুভকর্ম বলেছেন।
প্রকৃতি যেখানে মানুষের আহারের জন্য নানাবিধ বনস্পতি এবং স্বাদু পদার্থ উৎপন্ন করেছে, সেই প্রকৃতিই আবার মানুষের সেবা ও সহায়তার জন্য বিভিন্ন পশু-পক্ষীর সৃষ্টি করেছে। এই পশু-পক্ষী একদিকে যেমন প্রাকৃতিক ভারসম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে অন্যদিকে মানুষের সামান্য দয়া ও ভালোবাসা পেয়ে তারা মানুষের থেকেও বেশি প্রভু ভক্ত ও বিশ্বাসভাজন হয়ে জীবন দিয়ে তাদের সেবা করে।
সেই মানব, প্রকৃতি যাদের শরীরের গঠন মাংসাহারী প্রাণীদের মতো না করে নিরামিষাশী প্রাণীদের মতো করেছেন, তারা যদি প্রকৃতি, ধর্ম ও মহাপুরুষদের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে আমিষ ভক্ষণ করে, তাহলে সেটি হবে তাদের পক্ষে অত্যন্ত কৃতঘ্নতা ও দুষ্কর্ম।
জগতের সমস্ত জীব-জন্তু আমাদেরই মতো পরম পিতার সন্তান। সেই পরম পিতা কি তাঁর এক সন্তানের দ্বারা অন্য সন্তানের অকারণ হত্যা সহ্য করবেন ? না, কখনই নয়। কর্মের অবশ্যই ভোগ করতে হবে। শুভ বা অশুভ কোনো কর্ম কখনই বৃথা যায় না, তার পুরষ্কার বা শাস্তি আগে বা পরে অবশ্যই পেতে হয়। এ অতি নিশ্চিত ও অটল সত্য।
আমিষ আহারের কুফল সুবিদিত। এখন বিশ্বের সকল দিক্ থেকে বৈজ্ঞানিক এবং ডাক্তারেরা সতর্ক করছেন যে, আমিষ আহার ক্যান্সার ইত্যাদি দুরারোগ্য ব্যাধি দ্বারা আয়ু ক্ষীণ করে এবং নিরামিষ আহার অত্যন্ত পুষ্টিদায়ক এবং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে ; তা সত্ত্বেও মানুষ যদি অন্ধের মতো আধুনিকতার নকল করতে গিয়ে আমিষ খাদ্য ভক্ষণ করে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনে, তবে সেটি তার দুর্ভাগ্য ছাড়া অন্য কিছু নয়।
পশুকে হত্যা করার আগে তার শরীরের রোগ সম্বন্ধে কোনো পরীক্ষা করা হয় না, তাই তার শরীরের সম্ভাব্য রোগ আমিষ খাদ্য ভক্ষণকারী ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করে। ভয়াবহ পরিবেশে অন্যান্য পশুদের সামনেই ভীষণ কষ্ট ও যন্ত্রণা দিয়ে প্রতিটি পশুকে হত্যা করা হয়।
তার ফলে দুঃশ্চিন্তা (টেনশন), ভয়, ক্রোধ, আতঙ্কে পশুর রক্তচাপ বৃদ্ধি পায় এবং দেহে এ্যাডরিন্যালিন (Adrenalin) নামক পদার্থের সৃষ্টি হয়, তাতে তার মাংস বিষাক্ত হয়ে ওঠে। সেই বিষাক্ত, রোগগ্রস্ত মাংস আমিষ আহারীর শরীরে প্রবেশ করে তাকে নানা অসাধ্য রোগে আক্রান্ত করে আর সেই পশুটির মৃত্যুর মুহূর্তে করা শপথ যে 'তুমি যেমন আমাকে খাবে, আমিও তোমায় তেমনভাবে খাব', পূর্ণ করে।
আমিষাশী বন্ধুগণ ! দয়া করে পরের বার আমিষ খাদ্য গ্রহণের পূর্বে একবার মুরগী পালন কক্ষে গিয়ে এই মূর্ক প্রাণীদের ওপর কীভাবে অত্যাচার করে তাদের বধ করা হয়, সেই অত্যাচার-তাদের দুঃখ-কষ্ট, তাদের হত্যা করার পদ্ধতি দেখে, খাবার সময় সেগুলি চিন্তা করবেন এবং নিজেদের অন্তরাত্মাকে জিজ্ঞাসা করবেন যে, আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও মানবত্বের কী এই পরিচয় যে, আমরা শুধু নিজেদের রসনার স্বাদের জন্য এইসব নিরপরাধ প্রাণীদের জীবন চিরকালের জন্য ছিনিয়ে নিই, যা আমরা কখনোই তাদের ফিরিয়ে দিতে পারি না ?
প্রিয় বন্ধুগণ ! কৃপা করে নিজেদের লাভ ও ক্ষতির বিষয় চিন্তা করুন। আমিষ খাদ্য পুষ্টির পরিবর্তে শরীরে অসাধ্য রোগের সংক্রমণ করে আয়ু হ্রাস করে ; মন, বুদ্ধি ইত্যাদি দূষিত করে সুখ-শান্তি নষ্ট করে এবং আমাদের নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতন ঘটায়।
এটি শুধু আমাদের অনাগত বংশকে অসাধ্য রোগাক্রান্ত করে তাই নয়, এটি আমাদের অপার দুঃখ-কষ্টেও ফেলে দেয়। নিজের প্রাণপ্রিয় সন্তানকে মাংসাহার জনিত অসুখ, হৃদরোগ, ক্যান্সার এবং অন্য সামাজিক দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে রক্ষার জন্য আজই আমিষ খাদ্য পরিত্যাগ করুন। ভুল শোধরানোর জন্য যে কোনো মুহূর্তই উত্তম। শাস্ত্র অনুসারে 'আমিষ খাদ্য পরিত্যাগকারীর যজ্ঞকারীর মতো ফল লাভ হয়।
No comments