Header Ads

হিন্দু শব্দটির উৎপত্তি কোথায়? হিন্দু ধর্মের সংজ্ঞা ও পরিচিতি কি?

হিন্দু শব্দটির উৎপত্তি কোথায়?
হিন্দু ধর্মের সংজ্ঞা ও পরিচিতি কি?

Krishna

ভূমিকাঃ

হিন্দুধর্ম পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম ধর্ম তথা ধর্মবিশ্বাস।হিন্দু ধর্মাবলম্বীগণ স্বীয় ধর্মমতকে সনাতন ধর্ম নামেও মানেন।যদিও হিন্দু নামটি আধুনিককালে দেয়া তারপরেও হিন্দুধর্ম বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ধর্ম হিসেবে পরিচত।সনাতন ধর্ম হলো হিন্দু ধর্মের প্রচীন তম নাম। আবার হিন্দু ধর্ম বা সনাতন ধর্ম বৈদিক ধর্ম নামেও পরিচিত।সনাতন ধর্ম মুলত বেদ এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।সনাতনের ধর্মত্ত্বের মূল কথা হল ঈশ্বরের অস্তিত্বেই সকল কিছুর অস্তিত্ব বিরাজমান এবং সকল কিছুর মূলেই রয়েছেন স্বয়ং ঈশ্বর। সনাতন ধর্মের সাধারণ ধরনগুলির মধ্যে বৈদিক  ও লৌকিক হিন্দুধর্ম থেকে বৈষ্ণবধর্মের ন্যায় ভক্তিবাদী ধারার মতো একাধিক জটিল ও কঠিন মতবাদগুলির সমন্বয়ের এক প্রচেষ্টা লক্ষিত হয়।কর্মযোগ, যোগ, ধারণা,ইত্যাদি   বিষয়গুলিও হিন্দুধর্মের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।


হিন্দুধর্ম একমাত্র ধর্ম যা মহাবিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গঠিত। এই ধর্মের একক প্রতিষ্ঠাতা ঈশ্বর। যদিও লৌহযুগীয় ভারতের ঐতিহাসিক বৈদিক ধর্মে এই ধর্মের শিকড় নিবদ্ধ কিন্তু শুরুটা অনেক আগে।"প্রাচীনতম জীবিত ধর্মবিশ্বাস"হিসেবে হিন্দুধর্মকে বিশ্বে আখ্যা দেওয়া হয়।আফগানিস্তানের বাসিন্দা বা আফগানেরা হিন্দু শব্দটি আর্যদেরকে দিয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।কারন আফগানেরা সিন্দু নদের তীরবর্তী সনাতন ধর্মের সাধু সন্ন্যাসিদেরকে হিন্দু বলে ডাকতেন, তাই ধারনা করা হয় যে,এই ভাবেই হিন্দু নামটি এসেছে।কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে

এই তথ্যটি  সত্যতা নিশ্চিত করে না।সংস্কৃত সিন্ধু শব্দটি থেকে হিন্দু শব্দটি উৎসারিত হয়েছে।ঋগ্বেদে সিন্ধু ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহাসিক একটি নদীর নামে  সিন্ধু নদীর স্তুতি করা হয়েছে। পরবর্তীসময়ে

আল-আরবি সাহিত্যে হিন্দু  শব্দটির মাধ্যমে সিন্ধু নদ অববাহিকায় বসবাসকারী সকল জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়েছে।মুলত ৭১২ খৃষ্টাব্দে সিন্ধু প্রদেশ জয় করে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুর স্থলে হিন্দ শব্দটির ব্যাপক প্রচলন ঘটে। পরবর্তিতে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভারতীয় উপমহাদেশ নামের সমার্থক শব্দ হিসেবে হিন্দু বা হিন্দুস্থান শব্দটির উৎপত্তি হয়। এরপর এই শব্দের আক্ষরিক অর্থ দ্বারায়"হিন্দুদের দেশ"।


হিন্দু ধর্মের সংজ্ঞা ও পরিচিতি কি?

 হিন্দু শব্দটি প্রথমদিকে ধর্মনির্বিশেষে ভারতীয় উপমহাদেশের সকল বসবাসকারী মানুষের  ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।পরবর্তীসময় চৈতন্য ভাগবত ও চৈতন্যচরিতামৃত

 প্রভৃতি  কয়েকটি ষোড়শ-অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলা গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মগ্রন্থে  ম্লেচ্ছদের বা যবনের থেকে পৃথক করার জন্য হিন্দুধর্মাবলম্বীদের হিন্দু শব্দটি বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। ইউরোপীয় বণিক ও ঔপনিবেশিক শাসকেরা অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে  ভারতীয় ধর্মবিশ্বাসগুলির অনুস্বরনকারীদের একত্রে হিন্দু নামে আখ্যায়িত করে।ফলে ধীরে ধীরে হিন্দু শব্দটি অন্যান্য ধর্ম তথা আব্রাহামীয় ধর্মসমূহ অথবা অবৈদিক ধর্মবিশ্বাসগুলির (যেমন জৈনধর্ম, বৌদ্ধধর্ম ও শিখধর্ম) অনুগামী নন এবং সনাতন ধর্ম নামক ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত তাদের বাদ রেখে সনাতনীয় সকল ভারতীয় বংশোদ্ভুত মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়ে পড়ে।ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজি ভাষাতে ভারতের স্থানীয় দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলি বোঝাতে হিন্দুইজম বা হিন্দুধর্ম কথাটি চালু হয়।ভারতের

প্রথম উপরাষ্ট্রপতি বিশিষ্ট দার্শনিক সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন হিন্দুধর্মের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে একে "একটি বিশ্বাসমাত্র" বলে স্বীকার করেন। তিনি এই ধর্মের যুক্তি ও দর্শনের দিকটি বিচার করে, খোলাখুলিভাবেই এই মত ব্যক্ত করেন যে হিন্দুধর্মের সংজ্ঞা দান করা অসম্ভব।তিনি বলেন, শুধুমাত্র এই ধর্ম অনুশীলনই করা যায় এবং হিন্দুত্বকে ধর্ম না বলে জীবন ব্যবস্থা বলা উত্তম।

 মহাত্মা গান্ধী ও একই ধরনের মতামত প্রদান করে বলেছেন, হিন্দুত্বের সকল মানুষকে নিজ নিজ বিশ্বাসের অনুবর্তী থেকে ঈশ্বরের উপাসনা করা যায়।এভাবে করে অন্যান্য ধর্মের লোকদের পাশাপাশি স্বীয় ধর্ম পালনের মধ্য দিয়ে শান্তি ও সৌহার্দ্যের মধ্যে বসবাস করে জাগতিক তৃপ্তি লাভ করা যায়।

তেমনই কোনো কোনো পণ্ডিত সুসংজ্ঞায়িত ও রক্ষণশীল ধর্মীয় সংগঠন না বলে হিন্দুধর্মকে "অস্পষ্ট সীমানায়" বর্গায়িত করার পক্ষপাতী ছিলেন কিন্তু হাজারো ধর্মমত মহাবিশ্বে হিন্দুধর্ম কে কেন্দ্রীয় ধর্ম হিসেবে বলেন। । অন্যগুলি ঠিক কেন্দ্রীয় না হলেও এই পরিসীমার আওতার মধ্যেই 

পড়ে। এরই ভিত্তিতে ফেরো-লুজি হিন্দুধর্মের সংজ্ঞায়নে একটি "উদাহরণমূলক তাত্ত্বিক অন্বেষণ" ("প্রোটোটাইপ থিওরি অ্যাপ্রোচ") চালিয়েছেন।

তাই শ্রীগোবিন্দ দাস   বলেন

No definition is workable for religion, since it is unclear. [Hinduism: 45]

একই সুরে রাধাকৃষ্ণ এভাবে সংজ্ঞা প্রদান করে বলেছেন,

Nothing is more hard to be characterized than Hinduism.

শ্রী গিরির মতে,

বেদে স্বপ্রমিত ও সতঃসিদ্ব সত্যরাজি নিহিত এই কথা যে বিশ্বাস করে সেই হিন্দু আর তার এই ধর্মকে হিন্দু ধর্ম বলে।

স্বামী শ্রী বিষ্ণু শিবানান্দ গিরী তার রচিত হিন্দু ধর্মের প্রবেশিকায় লিখেছেন,

 ভারতে উদ্ভূত যেকোন ধর্মে যিনি বিশ্বাসী হবেন, তিনিই হিন্দু।

কিন্তু এই বক্তব্য সঠিক নয়।কারণ ভারতের লোকেরা পরবর্তীতে বিভিন্ন ধর্ম তথা   বৌদ্ব,জৈন,ব্রাহ্ম,বিষ্ণু প্রভ্রৃতি ধর্মের অনুসারী হওয়া শুরু করে। তাই ভ্যানকাটা রমন বলেন,


Radha krishna


যেসব ব্যক্তি ইসলাম,জৈন,বৌদ্ব,খ্রীষ্টান,পার্সী,ইয়াহূদী যা জগতের অন্যান্য ধর্মের অন্তর্ভূক্ত নয় এবং যাদের উপাসনার রুপ একেশ্বরবাদ থেকে ফেটিশবাদ পর্যন্ত প্রসারিত এবং যার ধর্মতত্ত্ব সম্পূর্ণরুপে সংস্কৃত ভাষায় লিখিত তাদেরকে হিন্দু রুপে এবং তাদের অবলম্বিত ধর্ম হল হিন্দু ধর্ম।

ড. পরেশমণ্ডল ও ড. দিলীপ কুমাড় ভট্টাচার্য বলেন,

বৈদিক এবং বেদ অনুমোদিত পৌরাণিক আদর্শ যারা সমাদর করে,বেদে ধর্মীয় শাস্ত্রানানোমোদিত বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান দ্বারা ধর্ম সাধনা,উপাসনা করেন এবং সনাতন ধর্মের কল্যাণ চিন্তাকে জীবনের প্রয়োগ করে,জীবন-যাপন করে তারা হিন্দু আর তাদের ধর্মে হল হিন্দু।

স্বামী বিষ্ণু বলেন


যিনি বর্ণাশ্রম ব্যবস্থায় নিষ্ঠাবান,গোবৎস বেদকে মাতৃতুল্য মনে করেন, দেবমূর্তিকে অবজ্ঞা করেন না,সকল ধর্মকে সমাদর করেন,পুনর্জন্মে বিশ্বাসী,সর্বজীবকে আত্মপৎ মনে করেন,তিনিই হিন্দু।

Oxford Dictionary তে বলা হয়েছে,

The primary religion social arrangement of India, which meludes the love of a few Gods and in resurrection. [Hinduism]

Reference book of Britannica তে বলা হয়েছে,

The name of Hinduism implies the civic establishments of the hindu. Initially the occupants of the place that is known for the place that is known for Indus waterways.

উনবিংশ শতকে হিন্দু   পুনর্জাগরণবাদীগণ 'হিন্দু-ইজম' শব্দটির প্রয়োগ শুরু করার পর থেকেই হিন্দুধর্ম একটি বিশ্বধর্ম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।এছাড়াও শব্দটির প্রাথমিক প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন পশ্চিমা প্রাচ্যবিদ বা 'প্রথম যুগের ভারততত্ত্ববিদগণ', যাঁদের বক্তব্য সাধারণত একপেশে ছিল বলে মনে করা হয়। যদিও হিন্দুধর্মের শিকড় ও তার বিভিন্ন শাখাপ্রশাখার প্রাচীনত্বের ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। সকলেই স্বীকার করেছেন যে প্রাগৈতিহাসিক সিন্ধু সভ্যতা থেকে ঐতিহাসিক বৈদিক সভ্যতার প্রাথমিক পর্ব জুড়ে ছিল হিন্দুধর্মের সূচনালগ্ন। কেবলমাত্র ধর্মবৈভিন্ন প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বৈদিক সংস্কারের ভিত্তিতে হিন্দুধর্মের একটি রূপ দান করেছেন পশ্চিমা প্রাচ্যবিদগণ - এমন কথাও বলেছেন কেউ কেউ। কিন্তু তা সত্য নয়।

পাশ্চাত্য দৃষ্টিকোণ থেকে, ধর্ম কি এবং কিভাবে তা আরও প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত তারই   বিচারে হিন্দুধর্মকে যাচাই করা হয়। 'ধর্মবিশ্বাস' ('ফেইথ') শব্দটি 'ধর্ম' ('রিলিজিয়ন') অর্থে প্রয়োগের ফলে এই বিষয়ে জটিলতা বৃদ্ধি পায়। কোনো কোনো পণ্ডিত এবং অনেক হিন্দু দেশীয় 'সনাতন ধর্ম'- এর সংজ্ঞাটির পক্ষপাতী।এই সংস্কৃত শব্দবন্ধটির অর্থ 'চিরন্তন ধর্ম (বিধি)' বা 'চিরন্তন পন্থা।

এই ধর্মের অন্যান্য নামসমূহ হল আর্য,সনাতন,বর্ণাশ্রম   ও ব্রাহ্ম ইত্যাদি।


No comments

Theme images by sndrk. Powered by Blogger.