শিব কে? শিবতত্ব কি? শিব কি ব্রহ্মার চাইতেও শ্রেষ্ঠ?
শিব কে? শিবতত্ব কি?
শিব কি ব্রহ্মার চাইতেও শ্রেষ্ঠ?
| ঔঁ শিবায়; |
জড় জগতের তিনটি অবস্থা সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয়। ব্রহ্মা হলেন সৃষ্টিকর্তা, বিষ্ণু হলেন পালনকর্তা, আর শম্ভু বা দেবাদিদেব মহাদেব হলেন সংহার কর্তা। সমগ্র জড় জগৎ জড় প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সত্ত্ব গুণের অধীশ্বর হলেন বিষ্ণু। রজ গুণের অধীশ্বর হলেন ব্রহ্মা এবং তম গুণের অধীশ্বর হলেন শিব বা শম্ভু।
#শিব’ শব্দটির অর্থ হলো ‘মঙ্গলময়’। তা সত্ত্বেও শ্রীমদ্ভাগবতের বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি ভগবান শিবের নির্মল স্বর্ণাভ দেহ ভষ্মের দ্বারা আচ্ছাদিত। তার জটাজুট শ্মশানের ধূলির প্রভাবে ধূম্র বর্ণ। তিনি সন্ধ্যাকালে ভূতগণ পরিবেষ্টিত হয়ে তাঁর তার বাহন বৃষভের পিঠে চড়ে ভ্রমণ করেন। অথচ ব্রহ্মার মতো মহাপুরুষেরা তাঁর শ্রীপাদপদ্মে নিবেদিত পুষ্প মস্তকে ধারণ করেন।
এই প্রসঙ্গে আর একটি বিষয় উল্লেখ্য, যদিও প্রকৃত ভগবান ব্রজেন্দ্রনন্দন কৃষ্ণ তবুও বৈদিক সাহিত্যে শিব, ব্রহ্মা বা কেন অত্যন্ত মহান ভগবদ্ভক্তের সম্বোধনেও ‘ভগবান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু স্বতন্ত্র পরমেশ্বর একমাত্র কৃষ্ণ।
আবার জন্মসূত্রে শিবের পিতা হলেন ব্রহ্মা। ব্রহ্মার অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁর প্রথম মানস পুত্র চতুষ্কুমারগণ প্রজা সৃষ্টিতে লিপ্ত হতে অস্বীকার করলে ব্রহ্মার অন্তরে দুর্বিসহ ক্রোধ উৎপন্ন হয়েছিল। যা তিনি সংবরণ করার চেষ্টা করলেও তা তাঁর ভ্রূর মধ্য থেকে বেরিয়ে এসেছিল এবং নীললোহিত বর্ণের একটি শিশু উৎপন্ন হয়েছিল। জন্মের পরেই শিশু ক্রন্দন বা রোদন করতে শুরু করে। ব্রহ্মা তখন বলেছিলেন “হে সুরশ্রেষ্ট। যেহেতু তুমি উৎকন্ঠিত হয়ে রোদন বা ক্রন্দন করেছ তাই প্রজাসমূহ তোমাকে ‘রুদ্র’ নামে অভিহিত করবে।” এ প্রসঙ্গে অনেকে প্রশ্ন করেন শিব ব্রহ্মার চাইতেও শ্রেষ্ঠ হলে ব্রহ্মা কিভাবে শিবের পিতা হলেন? এখানে আমাদের বুঝতে হবে ব্রহ্মা হচ্ছেন জীবতত্ত্ব কিন্তু শিব হচ্ছেন শম্ভুতত্ত্ব। ভগবান যে রকমই বিষ্ণুতত্ত্ব হয়েও আত্মামায়ার প্রভাবে জন্মগ্রহণ করেন সেইভাবে শিবও ব্রহ্মার থেকে আবির্ভূত হলেও তত্ত্বত শম্ভু তত্ত্ব।
#শিবতত্ত্ব
শিব জীবতত্ত্ব নন। শিব বিষ্ণুতত্ত্বও নন। শিব হচ্ছেন বিষ্ণুতত্ত্ব ও জীবতত্ত্বের মধ্যবর্তী শিবতত্ত্ব বা শম্ভুতত্ত্ব। বিষ্ণু তত্ত্বের মধ্যে ৬০টি দিব্যগুণ প্রকাশিত হয়। শুদ্ধ জীবাত্মার মধ্যে সর্বাধিক ৫০টি দিব্যগুণ প্রকাশিত হয় আর শিবতত্ত্ব বা শম্ভুতত্ত্বের মধ্যে ৫৫টি দিব্যগুণ প্রকাশিত হয়।
এই জড়জগত ভগবানের বহিরঙ্গা শক্তি সম্ভুত। বহিরঙ্গা শক্তি জড় হওয়ায় স্বতন্ত্র রূপে কিছু সৃষ্টি করতে সমর্থ নয়। ঠিক যেমন মাতা, পিতাপর সহায়তা বিনা সন্তান উৎপাদন করতে পারেন না। ভগবান তাঁর দৃষ্টির মাধ্যমে চিদ-জগৎ থেকে ভগবৎবিমূখ জীবাত্মাদের জড় জগতে প্রেরণ করলে, জড় জগতে সৃষ্টির সূচনা হয়।
এই জড় সৃষ্টির প্রথম জীব ব্রহ্মা। এই দৃষ্টি বা ঈক্ষণ সম্বন্ধে ঐতরেয় উপনিষদে বলা হয়েছে- “স ঐক্ষত” (ঐতরেয় উ.১/১/১) “স ইমাল্লোঁকান অসৃজত” (ঐতরেয় উ.১/১/২)। ভগবানের এই দৃষ্টিকেই বলা হয় শম্ভু। ভগবান সরাসরি তাঁর বহিরঙ্গা শক্তির সঙ্গে সঙ্গ করেন না-এই জন্যই একে ‘বহিরঙ্গা’ বলা হয়। তাই ভগবান শিব বা শম্ভু রূপে বহিরঙ্গা প্রকৃতির সঙ্গ করেন। বহিরঙ্গা শক্তি হলেন দুর্গা দেবী। এই জন্য জড় জগতে বিচারে শিব ও দুর্গা হলেন পিতা ও মাতা।
এ প্রসঙ্গে ব্রহ্মসংহিতা (৫/৯) বলা হয়েছে-“লিঙ্গযোন্যাত্মিকা মাতা ইমা মাহেশ্বরী প্রজাঃ” অর্থাৎ “এই জগতের সমস্ত মাহেশ্বরী (মহেশ্বর থেকে আগত) প্রজাই লিঙ্গযোনি স্বরূপ।” সেই কারণেই শিবলিঙ্গ রূপে শিবপূজার প্রচলন আমরা দেখতে পাই।
#শ্রী শিব হচ্ছেন আত্মারাম বা পূর্ণাত্মা উপলব্দির স্তরে অবস্থিত।
Facebook page for Hinduism45.com
No comments