Header Ads

আত্মা কি?

আত্মা কি?  


মনে করুন, আমি পোশাক পরিবর্তন করছি। কৈশোরে আমি একরকম পোশাক পরতাম, যৌবনে আমি আরেক ধরনের পোশাক পরতাম। এখন এই বৃদ্ধ বয়সে, একজন সন্ন্যাসী হিসাবে আমি ভিন্ন আরেক রকমের পোশাক পরছি। পোশাকগুলোর বদল হতে পারে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, পোশাকের মালিকটির মৃত্যু হয়েছে, সে হারিয়ে গেছে। না, আদৌ তা নয় আত্মার দেহাত্তরের এটি একটি সরল ব্যাখ্যা । এছাড়া, আমরা সকলেই এক একজন ব্যক্তি। সকলের একত্রে মিলে যাওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের প্রত্যেকেই এক একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি। ভগবান একজন ব্যক্তি, আর আমরাও ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিসত্তা। নিত্যো নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাম্  “সকল নিত্য, চেতন ব্যক্তিসত্তার মধ্যে তিনি হচ্ছেন পরম নিত্য চেতন ব্যক্তি।”  পার্থক্যটি এই যে, ভগবান কখনই তাঁর শরীর পরিবর্তন করেন না, কিন্তু এই জড় জগতে আমরা ক্রমাগত দেহ পরিবর্তন করতে থাকি!
  ঠিক যেমন শ্রীকৃষ্ণের দেহ সদ্-চিৎ-আনন্দময়, আনন্দময়, জ্ঞানময় শাশ্বত শরীর, তেমনি যখন আপনারা আপনাদের আপন আলয়ে ভগবদ্ধামে ফিরে যাবেন, আপনারাও একই ধরনের দেহ সদৃ-চিৎ-আনন্দময় শরীর প্রাপ্ত হবেন। পার্থক্যটি হচ্ছে, শ্রীকৃষ্ণ যখন জড়জগতে আসেন, তখন তিনি তার শরীর পরিবর্তন করেন না--স্বরূপে আসেন । সেজন্য তাঁর একটি নাম হচ্ছে অচ্যুত--“যিনি কখনো তাঁর স্থিতি থেকে চ্যুত হন না।" শ্রীকৃষ্ণ কখনোই পরিবর্তিত হন না। তিনি কখনো চ্যুত হন না, মায়াগ্রস্ত হয়ে পতিত হন না, কেননা তিনি মায়ার, জড়া শক্তির নিয়স্তা, ঈশ্বর। আমরা জড় শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, আর শ্রীকৃষ্ণ জড় শক্তির নিয়স্তা। সেটিই শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য।  আর তিনি কেবল মায়াশক্তির নিয়ন্ত্রণ করেন না, তিনি চিন্ময় শক্তি, অন্তরঙ্গা শক্তিরও নিয়স্তা- সকল শক্তিরই তিনি নিয়ন্তা। আমরা যা কিছু দেখি, যা কিছু প্রকাশিত, অভিব্যক্ত হয়েছে- সবই কৃষ্ণের শক্তি। ঠিক যেমন উত্তাপ ও আলোক সূর্যের শক্তি, তেমনি প্রকাশমান সবকিছুই শ্রীকৃষ্ণের শক্তিরাজির সমন্বয়ে গঠিত। শ্রীকৃষ্ণের শক্তি অনেক, কিন্তু তাদেরকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয় বহিরঙ্গা শক্তি, অন্তরঙ্গা শক্তি এবং তটস্থা শক্তি। আমরা, জীবসমূহ ভগবানের তটস্থা শক্তি তটস্থার অর্থ হচ্ছে, আমরা ইচ্ছা করলে বহিরঙ্গা শক্তির প্রভাবাধীনে থাকতে পারি, আবার অন্তরঙ্গা শক্তিরও প্রভাবাধীনে থাকতে পারি।  পছন্দের স্বাধীনতা আমাদের, জীবের রয়েছে। ভগবদ্গীতা বলার পর শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন, যথেচ্ছসি তথা কুরুঃ “তোমার যা ইচ্ছা, তাই কর।” শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এই পছন্দের স্বাধীনতা দিয়েছেন। তিনি কাউকে শরণাগত হতে বাধ্য করেন না। সেটি ভাল নয় । কোন কিছু জোরপূর্বক আরোপিত হলে সেটি স্থায়ী হয় না।  যেমন, আমরা আমাদের ছাত্রদের উপদেশ দিই, “খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠো।” এই হচ্ছে আমাদের উপদেশ। আমরা কাউকে বাধ্য করি না। অবশ্য, আমরা কাউকে একবার বা দু'বার বাধ্য করতে পারি, কিন্তু সে যদি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে অভ্যাস না করে, তাহলে বাধ্য করা নিরর্থক হয়ে যাবে, কোন কাজে আসবে না! ঠিক সেইরকম, শ্রীকৃষ্ণ কাউকে এই জড় জগৎ ত্যাগ করতে বাধ্য করেন না। সমস্ত বদ্ধজীবেরা শ্রীকৃষ্ণের বহিরঙ্গা, যা জড়া শক্তির প্রভাবাধীন।  যেহেতু আমরা শ্রীকৃষ্ণের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আমরা সকলেই প্রত্যক্ষভাবে শ্রীকৃষ্ণের পুত্র। আর যদি কোন পিতার পুত্র দুর্দশায় পড়ে, তাহলে পিতাও কষ্ট পান, পরোক্ষভাবে মনে করুন, পুত্রটি উন্মাদ হয়ে গেছে--অথবা, আজকাল যেমন দেখা যাচ্ছে, হিপি হয়ে গেছে । পিতা তখন খুবই দুঃখিত হন“ওঃ! আমার পুত্র এখন একজন হতচ্ছাড়ার মতো জীবন যাপন করছে। সুতরাং, তখন পিতা সুখী হতে পারেন না। ঠিক তেমনি, বদ্ধ জীবেরা জড়জগতে কত দুর্দশা ভোগ করছে, হতচ্ছাড়া, দুর্ভাগা, মূঢ়ের মতো জীবন যাপন করছে। সুতরাং, শ্রীকৃষ্ণ সুখী নন। সেজন্য, কিভাবে তাঁর কাছে ফিরে যাওয়া যায়, তিনি স্বয়ং ব্যক্তিগতভাবে আমাদের তা শিক্ষা দেওয়ার জন্য এই জড়জগতে আসেন। (যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ......... তদাত্মানং সৃজাম্যহম্)। যখন শ্রীকৃষ্ণ এখানে এই জগতে আসেন, তখন তিনি নিজের আদি নিত্যস্বরূপে আসেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ আমরা শ্রীকৃষ্ণকে আমাদের একজন বলে মনে করি এক অর্থে তিনি আমাদের মতো একজন, যেহেতু তিনি পিতা, আর আমরা তাঁর পুত্র । কিন্তু তিনি প্রধান, পরম নিত্যো নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাম্ ।  তিনি আমাদের চেয়ে বেশি শক্তিমান তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিমান, তিনি পরম শক্তিমান পুরুষ । সেটিই হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য। আমরা ভগবানের সমকক্ষ হতে পারি না । কেউই কৃষ্ণের সমকক্ষ হতে পারে না কিংবা তার থেকে শ্রেষ্ঠতর হতে পারে না। প্রত্যেকেই শ্রীকৃষ্ণের অধীন ।  একেলা ঈশ্বর কৃষ্ণ, আর সব ভৃত্যপ্রত্যেকে কৃষ্ণের ভৃত্য, সেবক, এবং শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন একমাত্র প্রভু। ভোক্তারং যজ্ঞতপসাম সর্বলোক মহেশ্বরম্ “আমি একমাত্র ভোক্তা; আমি সবকিছুর অধীশ্বর," শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন। আর সেটি বাস্তব সত্য। সুতরাং, আমরা আমাদের শরীর পরিবর্তন করছি, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাঁর দেহ পরিবর্তন করেন না। আমাদের এটি উপলব্ধি করতে হবে। তার প্রমাণ হচ্ছে, শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত--সবকিছু অবগত, ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে আপনারা দেখতে পাবেন, শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে, তিনি ভগবদ্গীতার এই তত্ত্বদর্শন সূর্যদেব বিবস্বানকে বলেছিলেন প্রায় ১২,০০,০০,০০০ (১২ কোটি) বছর আগে।  এতো সুদূর অতীতের কথা শ্রীকৃষ্ণ কিভাবে স্মরণ রাখতে পারেন? তার কারণ তিনি তাঁর দেহ পরিবর্তন করেন না। আমরা অনেক কিছু ভুলে যাই, তার কারণ হচ্ছে প্রতি মুহুর্তেই আমাদের দেহের পরিবর্তন হচ্ছে, আমরা শরীর পরিবর্তন করছি। এটি একটি শারীরবিদ্যাগত ঘটনা, চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত সত্য। আমাদের রক্তকণিকাগুলো প্রতি সেকেন্ডে পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু সমগ্র শরীরটির পরিবর্তন হচ্ছে অলক্ষিতে, অদৃশ্যভাবে। সেজন্যই একটি বেড়ে উঠতে থাকা শিশুর বাবা-মা লক্ষ্য করেন না, কিভাবে তাদের সন্তানটির দেহ রূপান্তরিত হচ্ছে। কোন তৃতীয় ব্যক্তি যদি কিছুকাল না দেখার পর আসেন, তিনি বুঝতে পারেন শিশুটি বড় হয়েছে; তিনি বলেন, “এই শিশুটি কত বড় হয়ে গেছে!” কিন্তু বাবা-মা হয়ত তার বৃদ্ধি লক্ষ্য করেননি, কারণ তাঁরা সবসময়ই তাকে দেখছেন, আর তাঁর দেহের রূপান্তর ঘটছে অদৃশ্যভাবে, অগোচরে--প্রতি মুহুর্তে।  সুতরাং, আমাদের শরীরটি সবসময়ই পরিবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু আমি, আত্মা--দেহের মালিকটির কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। এটি উপলব্ধি করতে হবে। আমরা সকলেই জীবাত্মা, আর আমরা শাশ্বত, কিন্তু যেহেতু আমাদের শরীরটির পরিবর্তন ঘটছে, সেজন্য আমরা জন্ম, মৃত্যু, জরা এবং ব্যাধির দুর্দশাগুলো ভোগ করতে বাধ্য হচ্ছি। কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদেরকে এই সদা-পরিবর্তনশীল অবস্থা থেকে মুক্ত করা । “যেহেতু আমি নিত্য, সনাতন, তাহলে কিভাবে আমি পুনায় সেই শাশ্বত চিরস্থায়ী অবস্থায় ফিরে যেতে পারি?”  সেটিই আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত। প্রত্যেকেই শাশ্বতকাল বাঁচতে চায়, কেউই মরতে চায় না। যদি আমি আপনার সামনে একটি রিভলভার নিয়ে উপস্থিত হই, আর বলি, “আমি তোমাকে এখনই হত্যা করব,” আপনি তৎক্ষণাৎ আতস্বরে চীৎকার করে উঠবেন, কেননা আপনি মরতে চান না।  এটি কোন ভাল কাজ কিছু নয়--মরে যাওয়া, তারপর আবার জন্ম নেওয়া। এটি অত্যন্ত কষ্টদায়ক। আমরা সকলেই অবচেতনভাবে এটি জানি। আমরা জানি যে, আমরা যখন মৃত্যুবরণ করি, তখন তারপর আমাদের আরেকজন মায়ের গর্ভে প্রবেশ করতে হবে; আর আজকাল তো মায়েরা তাদের গর্ভের মধ্যে সন্তানদের হত্যা করছে।  তারপর আবার আরেকজন মায়ের গর্ভে এভাবে চলতে থাকে। এভাবে একের পর এক দেহ ধারণের প্রক্রিয়াটি অত্যস্ত দীর্ঘ এবং অত্যন্ত কষ্টদায়ক। অবচেতন মনে আমরা এই সমস্ত কষ্ট ভোগান্তির কথা স্মরণ করতে পারি, আর সেজন্যই আমরা মরতে চাই না । অতএব, আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত এই“আমি সনাতন, শাশ্বত, তাহলে কেন আমাকে এই ক্ষণস্থায়ী অবস্থায় রাখা হয়েছে?” এই হচ্ছে প্রকৃত বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ প্রশ্ন । আর এটিই হচ্ছে আমাদের প্রকৃত সমস্যা। কিন্তু যারা নির্বোধ মূঢ়, দুষ্টবুদ্ধি, তারা এই প্রকৃত সমস্যাকে উপেক্ষা করে।  তারা সবসময়ই চিন্তা করছে কিভাবে আহার করবে, কিভাবে নিদ্রা যাবে, কিভাবে মৈথুন উপভোগ করবে, কিভাবে আত্মরক্ষা করবে। কিন্তু আপনি যদি অত্যন্ত সুন্দরভাবেও আহার করেন, এবং সুন্দরভাবে নিদ্রা যান, পরিশেষে আপনাকে মৃত্যুবরণ করতেই হবে। মৃত্যুর সমস্যাটি তখনও থাকছে। কিন্তু এরা এই আসল সমস্যাটির কোন গুরুত্ব দেয় না। তারা ক্ষণস্থায়ী সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্য অত্যন্ত তৎপর, সেগুলো প্রকৃতপক্ষে কোন সমস্যাই নয়।  পশু-পাখিরাও আহার করে, ঘুমায়, বংশবৃদ্ধি করে এবং আত্মরক্ষা করে। এগুলো কেমন করে করতে হয় তারা ভালই জানে, যদিও তাদের মানুষের মতো শিক্ষালাভের ব্যবস্থা নেই, মানুষের মতো তথাকথিত সভ্যতা নেই। সুতরাং, এগুলো আমাদের প্রকৃত সমস্যা নয়। আসল সমস্যাটি হচ্ছে মৃত্যু, আমরা মরতে চাই না, তবুও আমাদের মৃত্যুবরণ করতে হয়। এটিই আমাদের জীবনের প্রকৃত সমস্যা । কিন্তু মৃঢ়বুদ্ধি মানুষ এটি জানে না। তারা সবসময়ই ক্ষণস্থায়ী সমস্যাগুলো নিয়ে শশব্যস্ত । দৃষ্টাত্তস্বরূপ, মনে করুন, তীব্র শীতের আবহাওয়া রয়েছে। এটি একটি সমস্যা আমাদের তখন একটি সুন্দর উষ্ণ কোট খুঁজতে হয়, ফায়ারপ্লেস খুঁজতে হয়; আর যদি সেগুলো পাওয়া না যায়, তাহলে আমাদের দুরাবস্থায় পড়তে হয়।  সুতরাং, তীব্র শীত একটি সমস্যা। কিন্তু এটি একটি ক্ষণস্থায়ী, সমস্যা। তীব্র শৈত্য, শীত ঋতু আসে যায়। এটি কোন স্থায়ী সমস্যা নয়। আমার স্থায়ী সমস্যা হচ্ছে। অজ্ঞানতাবশতঃ আমি জড়দেহে জন্মগ্রহণ করছি, আমি ব্যাধি স্বীকার করছি, বার্ধক্য স্বীকার করছি, মৃত্যুকে স্বীকার করছি। এগুলোই আমার প্রকৃত সমস্যা। সেজন্য শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “জন্ম-মৃত্যু-জরা ব্যাধি দুঃখ-দোষানুদর্শনম্ যাদের প্রকৃত জ্ঞান হয়েছে, তারা এই দুঃখগুলো দর্শন করে--জন্ম, মৃত্যু, জরা আর ব্যাধি ॥”

No comments

Theme images by sndrk. Powered by Blogger.