Header Ads

রূপগঞ্জে সাঁওতাল তরুণী রিয়া সরেনের রহস্যজনক মৃত্যু: হত্যার অভিযোগ, তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

 রূপগঞ্জে সাঁওতাল তরুণী রিয়া সরেনের রহস্যজনক মৃত্যু: হত্যার অভিযোগ, তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ১৯ বছর বয়সী সাঁওতাল তরুণী রিয়া সরেনের রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের একাংশের দাবি, ঘটনাটি আত্মহত্যা নয়; বরং রিয়াকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা ময়নাতদন্তের ফল প্রকাশিত হয়নি। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

নিহত রিয়া সরেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার কুশদহ ইউনিয়নের বাঘদাবড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি দরিদ্র মা রিবিকা মুরমুর একমাত্র মেয়ে ছিলেন। বাবা না থাকায় পরিবারের আর্থিক সহায়তার জন্য অল্প বয়সেই কর্মজীবনে প্রবেশ করেন রিয়া। গত প্রায় ৭–৮ মাস ধরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মুড়াপাড়ায় অবস্থিত ACI Salt Limited-এ কর্মরত ছিলেন তিনি।

একাই থাকছিলেন ভাড়া বাসায়

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রিয়া তার এক মুসলিম বান্ধবীর সঙ্গে মঙ্গলখালির একটি টিনের তৈরি এক কক্ষের ভাড়া বাসায় থাকতেন। ঘটনার কয়েকদিন আগে তার রুমমেট নিজ বাড়িতে চলে যাওয়ায় রিয়া তখন ওই বাসায় একাই ছিলেন বলে জানা গেছে।

বাসাটির মালিক ছিলেন তানিয়া বেগম। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তানিয়া নিজেও একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন এবং রিয়ার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

রিয়ার স্বজন ও স্থানীয়দের অভিযোগ, তানিয়া রিয়াকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো কাছে রাখতেন। তার বাসায় রিয়ার নিয়মিত যাতায়াত, খাওয়া-দাওয়া ও বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করার বিষয়টিও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

এমনকি রিয়াকে ধর্মান্তরিত করে একজন মুসলিম ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা তানিয়া বিভিন্ন সময়ে রিয়ার মা ও আত্মীয়দের কাছে প্রকাশ করেছিলেন—এমন অভিযোগও করেছেন নিহতের স্বজনরা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

৭ সেপ্টেম্বর সকালে মরদেহ উদ্ধার

পরিবারের দাবি, ৬ সেপ্টেম্বর দিনের শিফটের কাজ শেষে রিয়া বাসায় ফেরেন। রাতে খাবার খাওয়ার পর আনুমানিক রাত ৮টা ৩০ মিনিট থেকে ৯টার মধ্যে তিনি নিজের মুঠোফোন থেকে মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর তিনি ঘুমাতে যান বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

পরদিন, ৭ সেপ্টেম্বর সকালে রিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা তার ঘরে গিয়ে বিছানার ওপর তার নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন বলে দাবি করেছেন।

ঘটনাস্থলে তখন বাড়ির মালিক তানিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

মৃত্যুর কারণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য

স্থানীয়দের দাবি, প্রথমদিকে রিয়ার মৃত্যুকে স্ট্রোকজনিত মৃত্যু বলে জানানো হয়েছিল। পরে গলায় আঘাতের চিহ্ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা বলা হয়।

আরও দাবি করা হয়, রিয়া গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন এবং পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে মরদেহ নামিয়ে আনেন।

তবে স্থানীয় কয়েকজনের প্রশ্ন—রিয়ার মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় কেউ দেখেছেন কি না এবং কে বা কারা মরদেহ নামিয়েছেন, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

এ ছাড়া ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয়দের কেউ কেউ রিয়ার গলায় আঘাতের চিহ্ন দেখেছেন বলে দাবি করেছেন। এসব চিহ্নের প্রকৃতি আত্মহত্যা, হত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে—তা ফরেনসিক ও ময়নাতদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।

নিখোঁজ মুঠোফোন ঘিরেও প্রশ্ন

রিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, মৃত্যুর আগের রাতে যে মোবাইল ফোন দিয়ে রিয়া মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, সেটি ঘটনাস্থলে পাওয়া যাচ্ছে না।

মৃত্যুর আগে ওই ফোনে কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, কললিস্টে কী তথ্য রয়েছে এবং ফোনটি বর্তমানে কোথায়—এসব বিষয় তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফোনটির কল রেকর্ড, লোকেশন ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য যাচাই করতে পারে।

স্থানীয়দের বিভিন্ন প্রশ্ন

ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে কয়েকটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—

রিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী?

প্রথমে স্ট্রোক এবং পরে আত্মহত্যার কথা কেন বলা হয়েছিল?

রিয়ার গলায় থাকা আঘাতের চিহ্নের প্রকৃতি কী?

মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় সত্যিই পাওয়া গিয়েছিল কি না?

যদি ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়, তাহলে কে মরদেহ নামিয়েছিল?

রিয়ার মোবাইল ফোনটি কোথায়?

মৃত্যুর আগে ও পরে তার সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন?

ঘটনাস্থলের আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

পুলিশের তদন্ত ও ময়নাতদন্ত

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলের দিকে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।

পরবর্তীতে নিহতের পরিবারের সদস্যরা নারায়ণগঞ্জে আসেন এবং মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয় বলে জানা গেছে। তবে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত রিয়া সরেনের মৃত্যুকে হত্যা বা আত্মহত্যা—কোনোটিই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের বিষয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

রিয়া সরেন ছিলেন মাত্র ১৯ বছরের একজন তরুণী। দরিদ্র পরিবারের একমাত্র সন্তান হিসেবে মায়ের পাশে দাঁড়াতে তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেছিলেন। তার এমন আকস্মিক মৃত্যু পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে।

নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপ ছাড়াই ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, গলায় আঘাতের চিহ্ন, মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ঘটনার সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

যদি এটি হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, তাহলে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। আর যদি আত্মহত্যা হয়ে থাকে, তাহলেও আত্মহত্যার পেছনে কোনো প্ররোচনা, চাপ বা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

আইনের চোখে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। একজন দরিদ্র পরিবারের তরুণীর মৃত্যুর ক্ষেত্রেও তদন্ত যেন কোনোভাবেই প্রভাবিত না হয়—এটাই নিহতের পরিবার ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

প্রশাসনের কাছে দাবি

রিয়া সরেনের মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা হোক। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জনগণের সামনে পরিষ্কার করা হোক।

একই সঙ্গে নিহতের পরিবারের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

রিয়া সরেনের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন হোক—সত্য সামনে আসুক, দোষী যে-ই হোক আইনের আওতায় আসুক।

তথ্যসূত্র: নিহতের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয়দের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। তদন্ত ও ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাবে।

No comments

Theme images by sndrk. Powered by Blogger.