অভয়নগরে ১০ দিন নিখোঁজ স্কুলছাত্রী উদ্ধার: মূল হোতা বাবা-ছেলে গ্রেপ্তার
অভয়নগরে ১০ দিন নিখোঁজ স্কুলছাত্রী উদ্ধার: অপহরণ ও পাচার চক্রের বাবা-ছেলে গ্রেপ্তার
নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর: যশোরের অভয়নগরে টানা ১০ দিন নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে উদ্ধার হয়েছে নবম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৪)। নারী অপহরণ ও পাচারকারী চক্রের খপ্পর থেকে কৌশলে পালিয়ে রক্ষা পায় সে। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মূল পরিকল্পনাকারী বাবা ও ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— নড়াইলের কালিয়া উপজেলার খড়রিয়া গ্রামের মুজাহিদ মোল্লা ও তার ছেলে রাতুল শেখ (২১)।
বৃহস্পতিবার দুপুরে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর অপহরণ ও পাচারের তথ্য নিশ্চিত করেন।
প্রলোভন ও অপহরণের ঘটনা
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী ছাত্রীটি অভয়নগর থানার সিদ্ধিপাশা ইউনিয়নের নলামারা গ্রামের বাসিন্দা। বেশ কিছুদিন ধরে মাসে এক লাখ টাকার বেশি আয়ের কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই ছাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিল রাতুল ও তার বাবা মুজাহিদ। কিন্তু তাদের কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায়, গত ২০ সেপ্টেম্বর দুপুর দেড়টা থেকে আড়াইটার মধ্যে অভয়নগরে বাড়ির সামনের রাস্তা থেকে জোরপূর্বক একটি মোটরসাইকেলে করে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
দীর্ঘ সন্ধান ও মামলা দায়ের
স্কুলছাত্রীকে খুঁজে না পেয়ে প্রথমে তার পরিবার অভয়নগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। পরবর্তীতে ঘটনার পেছনে রাতুলের সম্পৃক্ততার কথা জানতে পেরে পরিবারের সদস্যরা তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অভিযুক্তরা মেয়েটিকে ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে।
কোনো উপায় না পেয়ে ওই ছাত্রীর বোন বাদী হয়ে রাতুল, তার বাবা ও বোনসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪/৫ জনকে আসামি করে অভয়নগর থানায় একটি অপহরণ ও পাচার মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে গত ২৭ সেপ্টেম্বর পুলিশ অভিযান চালিয়ে রাতুল ও মুজাহিদকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়।
যেভাবে পালিয়ে বাঁচে স্কুলছাত্রী
উদ্ধার হওয়া স্কুলছাত্রী জানায়, অপহরণের পর রাতুল ও মুজাহিদ তাকে প্রথমে খুলনার সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যায়। সেখান থেকে অন্য সহযোগীদের মাধ্যমে বাসে করে তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকার একটি অজ্ঞাত স্থানে (প্রাথমিক তথ্যে ঢাকার গুলশান ও পরবর্তীতে গুলিস্তান এলাকা সংশ্লিষ্ট) একটি দোতলা বাড়ির কক্ষে তাকে আটকে রাখা হয়। সেখানে আসিফ নামে এক ব্যক্তি ও একজন নারী পাহারায় ছিলেন। ওই কক্ষে আরও ৪ জন মেয়েকে আটকে রাখা হয়েছিল এবং কথা বললেই তাদের মারধর করা হতো।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরে আটকে রাখারা ঘুমিয়ে পড়লে সুযোগ বুঝে ওই কক্ষ থেকে কৌশলে পালিয়ে আসে স্কুলছাত্রীটি। এরপর সে কোনোমতে ঢাকার গুলিস্তানের টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসের কাউন্টারে পৌঁছে সেখান থেকে ফোনের মাধ্যমে তার বোনের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
পুলিশের তৎপরতায় উদ্ধার
কৌশলে পালিয়ে আসা ছাত্রীর ফোনের তথ্য পেয়ে তদন্ত কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে গুলিস্তান কাউন্টার কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তাকে খুলনার বাসে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। একই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাসটি খুলনার সোনাডাঙ্গা কাউন্টারে পৌঁছালে পুলিশ তাকে নিরাপদ হেফাজতে নেয়। বর্তমানে সে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রয়েছে এবং নিজের পরিবারের কাছে ফিরেছে। মেয়েটিকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেয়ে পরিবারে স্বস্তি নেমে এসেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত রাতুল ও মুজাহিদ একটি সক্রিয় নারী অপহরণ ও আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ পাচারকারী চক্রের সদস্য। এই চক্রের বাকি সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

No comments